প্রকাশিত:
১৯ জানুয়ারী, ২০২৬

ফরাসি বার্তাসংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা জানায়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইরানি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল লস অ্যাঞ্জেলেসে কয়েক হাজার মানুষ মিছিল করেন। নিউইয়র্কেও কয়েকশ’ মানুষ সমাবেশে অংশ নেন।
রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর ‘গণহত্যার’ প্রতিবাদে এবং সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার দাবির সমর্থনে গতকাল (১৮ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ও পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম ইরানি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত লস অ্যাঞ্জেলেস ছাড়াও নিউ ইয়র্কের রাজপথ ছিল প্রতিবাদী মানুষের উপস্থিতিতে উত্তাল।
রোববার দুপুরে লস অ্যাঞ্জেলেসের সিটি হলের সামনে কয়েক হাজার মানুষ জমায়েত হন। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান ইরানি প্রশাসনের পতন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বর্বরতা বন্ধের দাবিতে স্লোগান দেন।
তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল: ‘নতুন হলোকাস্ট বন্ধ করো’ (Stop the New Holocaust), ‘গণহত্যা রুখে দাঁড়াও’ (Stand against Genocide),‘ইরানিদের স্বাধীনতা দাও’ (Free Iran)।
লস অ্যাঞ্জেলেসে আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেওয়া পেরি ফারাজ বলেন, আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত। আমি এতটাই ক্ষুব্ধ যে ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।
একই দিনে নিউ ইয়র্কের রাজপথে কয়েকশ মানুষ সংহতি সমাবেশ করেন। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, একই ধরনের সংহতি পদযাত্রা লন্ডন, প্যারিস এবং ইস্তাম্বুলেও দেখা গেছে। বিক্ষোভকারীরা ইরানের ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (IRGC)-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করার এবং বিশ্বনেতাদের আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে কেন্দ্র করে ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে যে বিক্ষোভ শুরু হয়, তা দ্রুতই সরকার বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এটি ইরানি নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রেখে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানের পর আন্দোলন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই অভিযানকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ বর্তমানে বর্তমান প্রশাসনের বিদায়ের দাবিতে রূপ নিয়েছে। নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (IHR)-এর তথ্যমতে:
এখন পর্যন্ত অন্তত ৩,৪২৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা গেছে। প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ৫,০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে অনেক সংস্থা আশঙ্কা করছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৬৫ বছর বয়সী আইনজীবী আলি পারভানেহ বলেন, ‘জনগণের ওপর এই নির্বিচার হত্যাকাণ্ড ভীষণভাবে কষ্টদায়ক।’তার মতো অনেকেই ‘মেক ইরান গ্রেট এগেইন’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেন। তিনি বলেন, ইরানের প্রভাবশালী ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) লক্ষ্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ চান তারা।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের অনেককেই ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভির সমর্থনে স্লোগান দিতে দেখা গেছে। তারা মনে করছেন, বর্তমান সংকটে বহির্বিশ্বে থাকা ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। অনেক বিক্ষোভকারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপের দাবিও জানান।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, বিশ্ব সম্প্রদায় ইরানের সাধারণ মানুষের এই ত্যাগকে যেন উপেক্ষা না করে। লস অ্যাঞ্জেলেসের সমাবেশে অংশ নেওয়া এক আইনজীবী বলেন, "আমাদের ভাই-বোনদের ওপর যে বর্বরতা চলছে, তা দেখে আমরা ঘরে বসে থাকতে পারি না।"
লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়েস্টউড এলাকাটি ‘ তেহরানজেলেস’ নামেও পরিচিত। রেস্তোরাঁটির মালিক রুজবেহ ফারাহানিপুর বলেন, প্রবাসীদের উচিত ইরানিদের পাশে দাঁড়ানো, তবে তাদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার অধিকার খর্ব না করা।
যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল পদযাত্রা ইরানের ভেতরে লড়াই করা সাধারণ মানুষের মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সাথে এটি ওয়াশিংটনের ওপর ইরানের বিষয়ে আরও কঠোর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির জন্য একটি বার্তা হিসেবে কাজ করবে।